রাজধানীর সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চলাচল স্বাভাবিক রাখার দাবিতে সম্প্রতি এক নারীর আবেগঘন বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে। বক্তব্যে তিনি নিজেকে শ্রমিকদের ‘বোন’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে সরকারের কাছে তিন মাসের সংসার খরচ, সন্তানদের স্কুলের ফি এবং অটোরিকশার মালিকদের ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে দাবি পূরণ না হলে রাজপথ অচল করে দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে বলে জানা যায়।
একজন নাগরিক হিসেবে শ্রমজীবী মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবিকার বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তবে কোনো দাবি আদায়ের ক্ষেত্রে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি, সড়ক অবরোধ কিংবা রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা বিঘ্নিত করার হুমকি কোনোভাবেই সমাধানের পথ হতে পারে না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই নারীর পরিচয় ও অটোরিকশা ব্যবসার সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা নিয়ে নানা দাবি ছড়িয়েছে। তবে এসব দাবির সত্যতা যাচাই ছাড়া সেগুলোকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা সমীচীন নয়। বরং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত বিষয়টি তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে যাচাই করা।
বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিষয়টি কতটা উদ্বেগের?
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তে থাকায় এর চার্জিংয়ের জন্য ব্যবহৃত বিদ্যুতের পরিমাণ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। দেশে কতসংখ্যক ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা রয়েছে, তারা প্রতিদিন গড়ে কত ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করে এবং সেই বিদ্যুৎ বৈধ উপায়ে সরবরাহ করা হচ্ছে কি না—এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য সরকারি তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন।
শুধু অনুমানের ভিত্তিতে বিপুল অঙ্কের বিদ্যুৎ অপচয় বা আর্থিক ক্ষতির কথা বলা ঠিক নয়। তবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা যখন জ্বালানি ব্যয়, উৎপাদন সক্ষমতা এবং জাতীয় চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিচালনা করতে হয়, তখন অনিয়ন্ত্রিত চার্জিং ব্যবস্থার প্রভাব নিয়ে নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই ভাবতে হবে।
বিশেষ করে আবাসিক সংযোগ, অবৈধ সংযোগ কিংবা অনুমোদনহীন চার্জিং স্টেশনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ব্যবহারের অভিযোগ থাকলে তা নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। একই সঙ্গে বৈধ ও নিরাপদ চার্জিং অবকাঠামো গড়ে তোলার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।
জননিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে ঘিরে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের একটি হলো সড়ক নিরাপত্তা। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহর ও মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ অংশে এসব যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
অবশ্যই প্রতিটি দুর্ঘটনার দায় কোনো একটি নির্দিষ্ট যানবাহন বা চালকের ওপর এককভাবে চাপানো যায় না। সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে চালকের প্রশিক্ষণের অভাব, বেপরোয়া গতি, সড়কের অব্যবস্থাপনা, পথচারীর অসতর্কতা এবং ট্রাফিক আইন না মানাসহ নানা কারণ থাকে।
তাই অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে আবেগের বদলে প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত। কোথায় এসব যান চলবে, কোথায় চলবে না, কতটি যান অনুমোদিত হবে, চালকদের কী ধরনের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স প্রয়োজন এবং যানবাহনের কারিগরি নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা জরুরি।
শ্রমিকদের জীবিকার বিষয়টিও উপেক্ষা করা যাবে না
এখানে আরেকটি বাস্তবতাও স্বীকার করতে হবে। হাজার হাজার মানুষ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। হঠাৎ করে কোনো বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া তাঁদের কর্মসংস্থান বন্ধ হয়ে গেলে পরিবারগুলো সরাসরি অর্থনৈতিক সংকটে পড়তে পারে।
তাই নিয়ন্ত্রণের নামে শুধু নিষেধাজ্ঞা জারি করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রকৃত চালকদের নিবন্ধন, প্রশিক্ষণ, বৈধ রুট নির্ধারণ, নিরাপদ যানবাহন ব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োজন হলে বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে।
একই সঙ্গে অটোরিকশার মালিক, গ্যারেজ ব্যবসায়ী এবং চালকদের মধ্যে কার প্রকৃত ভূমিকা কী—সেটিও আলাদা করে দেখা দরকার। শ্রমিকের অধিকারের কথা বলে যদি কোনো পক্ষ অতিরিক্ত বাণিজ্যিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করে, সেটিও নজরদারির আওতায় আসা উচিত।
জাতীয় স্বার্থে প্রয়োজন ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত
কর্মসংস্থান যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি জননিরাপত্তা, যানজট নিয়ন্ত্রণ, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা এবং আইনশৃঙ্খলাও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কোনো একটি পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে দুর্ভোগে ফেলা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
আবার শ্রমজীবী মানুষের জীবিকা রক্ষার বিষয়টিও অবহেলা করা যাবে না। তাই প্রয়োজন এমন একটি বাস্তবসম্মত নীতিমালা, যেখানে একদিকে জননিরাপত্তা ও জাতীয় সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে প্রকৃত শ্রমজীবী মানুষের কর্মসংস্থানও যতটা সম্ভব সুরক্ষিত থাকবে।
আবেগ, হুমকি কিংবা জনদুর্ভোগ সৃষ্টি নয়—তথ্য, আইন ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে অটোরিকশা খাতের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করাই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর পথ। জাতীয় সম্পদের সঠিক ব্যবহার এবং সাধারণ মানুষের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব; আর সেই দায়িত্ব পালনে প্রয়োজন দৃঢ়তা, স্বচ্ছতা ও বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত।
