ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিদেশগামী মানুষের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাসপোর্ট অফিসেও বেড়েছে সেবাপ্রার্থীদের চাপ। তবে গুরুত্বপূর্ণ এই সরকারি সেবা নিতে গিয়ে হয়রানি ও অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন কয়েকজন আবেদনকারী। তাদের অভিযোগ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসকে ঘিরে ‘চ্যানেল’ নামে একটি মধ্যস্বত্বভোগী গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, কথিত এই ‘চ্যানেল’-এর মাধ্যমে পাসপোর্টের কাজ করাতে সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে কাজের ধরন ও জরুরিতার ভিত্তিতে ৩ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের উপপরিচালক মো. শাহজাহান কবির। আবেদনকারীদের একটি অংশের দাবি, তিনি ‘দরবেশ বাবা’ নামে পরিচিত।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ পাসপোর্ট-সংক্রান্ত সেবা নিতে অফিসটিতে আসেন। সরেজমিনে অফিসে সেবাপ্রার্থীদের ভিড় দেখা গেছে। তাদের কয়েকজনের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে সরাসরি আবেদন করলে নানা ধরনের ত্রুটি দেখিয়ে ফাইল ফেরত দেওয়া হয়। কিন্তু একই কাগজপত্র কথিত ‘চ্যানেল’-এর মাধ্যমে জমা দিলে সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান হয়ে যায়।
সেবাপ্রার্থীদের দাবি, এভাবে কাজ করিয়ে নিতে সরকারি ফির বাইরে আবেদনপ্রতি ৩ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। জরুরি কাজের ক্ষেত্রে টাকার পরিমাণ আরও বেড়ে যায় বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অর্থ লেনদেনের পক্ষে স্বাধীন কোনো নথি বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
পাসপোর্ট অফিসের ভেতরে বহিরাগত ব্যক্তির সরকারি কম্পিউটার ব্যবহারের ঘটনাও অনুসন্ধানে সামনে এসেছে। সরেজমিনে অফিসের একটি কক্ষে জহির নামে এক ব্যক্তিকে কম্পিউটারে পাসপোর্ট-সংক্রান্ত কাজ করতে দেখা যায়। তার কাছে কয়েকজনকে কাগজপত্র নিয়ে আসতেও দেখা যায়।
পরিচয় জানতে চাইলে ওই ব্যক্তি একটি আবেদনপত্র দিয়ে মুখ আড়াল করার চেষ্টা করেন এবং দ্রুত সরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পরে তাকে সহকারী হিসাবরক্ষক মো. জয়নাল আবেদীনের কক্ষের দিকে যেতে দেখা যায়। পুলিশের সহায়তায় তাকে আটক করা হলে তিনি আবারও জয়নাল আবেদীনের কাছে যান। তবে ক্যামেরার সামনে জয়নাল আবেদীন ওই ব্যক্তিকে চেনেন না বলে দাবি করেন।
পরে তাকে উপপরিচালক মো. শাহজাহান কবিরের কাছে নেওয়া হয়। সেখানে ওই ব্যক্তিকে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলে অনুসন্ধানে উঠে আসে। পরবর্তীতে ওই ব্যক্তি জানান, তিনি একসময় আনসার সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং বর্তমানে পাসপোর্ট অফিসে এসে বিভিন্ন ধরনের কাজ করেন।
তবে সরকারি অনুমোদিত জনবলের বাইরে থেকে তিনি কীভাবে সরকারি কম্পিউটার বা সার্ভারে কাজ করার সুযোগ পেলেন, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
অফিসের বিভিন্ন কক্ষে বহিরাগতদের অবাধ চলাচলের অভিযোগও রয়েছে। পাসপোর্ট অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর দাবি, এসব ব্যক্তির কেউ কেউ কথিত দালালচক্রের সঙ্গে যুক্ত। তাদের অভিযোগ, অফিসের ভেতরে দালালদের যাতায়াত থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।
এদিকে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও নৈশপ্রহরীদের দায়িত্বের বাইরে কিছু কাজ করতে দেখা গেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি কম্পিউটার ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ব্যবস্থায় অননুমোদিত ব্যক্তির প্রবেশের বিষয়টি নিরাপত্তার দিক থেকেও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে প্রতিদিন গড়ে ৩০০টির বেশি আবেদন জমা পড়ে। এর একটি অংশ কথিত ‘চ্যানেল’-এর মাধ্যমে আসে বলে অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগীদের কয়েকজনের দাবি, প্রতিটি আবেদনে গড়ে প্রায় ৩ হাজার টাকা অতিরিক্ত নেওয়া হয়। সেই হিসাবে প্রতিদিন কয়েক লাখ টাকা অতিরিক্ত আদায়ের সুযোগ তৈরি হয়।
একজন কর্মকর্তা দাবি করেন, কথিত ‘চ্যানেল’ থেকে আদায় করা অর্থ সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে ভাগ-বাটোয়ারা করা হয়। তার অভিযোগ, অর্থের একটি বড় অংশ একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে যায় এবং বাকিটা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ভাগ করা হয়। ‘চ্যানেল’-এর সঙ্গে যুক্ত বলে পরিচয় দেওয়া একজন ব্যক্তিও একই ধরনের দাবি করেছেন।
তবে এসব অর্থ লেনদেনের অভিযোগের পক্ষে কোনো নথি বা স্বাধীন প্রমাণ প্রতিবেদকের হাতে আসেনি।
কথিত ‘চ্যানেল’ পরিচালনায় উপপরিচালক মো. শাহজাহান কবিরের পাশাপাশি উপসহকারী পরিচালক মোর্শেদুল হক এবং সহকারী হিসাবরক্ষক মো. জয়নাল আবেদীনের সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে। অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী দাবি করেন, অনিয়মের বিষয়ে কথা বললে তারা চাপ বা হয়রানির আশঙ্কায় থাকেন। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সভাপতি কবি আব্দুল মান্নান বলেন, পাসপোর্ট অফিসে সেবাপ্রার্থীদের ভোগান্তির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। তার মতে, এত অভিযোগের পরও কার্যকর ব্যবস্থা না হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পাসপোর্ট অফিসের বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ রয়েছে। তার দাবি, এসব অভিযোগের ভিত্তিতে আগে তদন্ত ও অভিযানও পরিচালিত হয়েছে। তবে কিছু সময় পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকার পর আবারও আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ বলেন, পাসপোর্ট অফিস জেলা প্রশাসনের সরাসরি আওতাধীন নয়। তবে জেলার নাগরিকরা সেখানে কোনো ধরনের সমস্যা বা হয়রানির শিকার হলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে। জেলা প্রশাসনের অভিযোগ সেলে নাগরিকরা তাদের সমস্যার কথা জানাতে পারবেন বলেও জানান তিনি।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. নূরুল আনোয়ার এবং অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) এটিএম আবু আসাদের বক্তব্য জানতে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তারা ফোন রিসিভ করেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। ফলে এ বিষয়ে অধিদপ্তরের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
পাসপোর্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সেবা নিয়ে ওঠা এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। বিশেষ করে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, দালালদের ভূমিকা এবং সরকারি কম্পিউটার ব্যবহারের মতো অভিযোগগুলো যথাযথভাবে তদন্ত করা হলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জন্য পাসপোর্ট সেবা আরও স্বচ্ছ, সহজ ও হয়রানিমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
