ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি: ‘মারো টান, হেইও…’—মাঝিদের সমবেত হাঁক আর বৈঠার ছন্দে মুখর হয়ে উঠেছিল তিতাস নদীর বুক। নদীর দুই তীরে হাজারো মানুষের উচ্ছ্বাস আর করতালিতে তৈরি হয় উৎসবের আবহ। দীর্ঘ তিন বছর পর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস নদীতে অনুষ্ঠিত হলো ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) বিকেলে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ নৌকা বাইচ ঘিরে তিতাসের দুই পাড়ে নামে মানুষের ঢল। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে যুবক ও বৃদ্ধ—সব বয়সী মানুষ ভিড় করেন নদীর তীরে। নৌকা বাইচকে ঘিরে পুরো এলাকা পরিণত হয় মিলনমেলায়।
বৈঠার ছন্দে মুখর তিতাস
ভাদ্রের বিকেলে রোদের তেজ কমে আসতেই নদীর দুই পাড়ে বাড়তে থাকে দর্শনার্থীর ভিড়। প্রতিযোগিতা শুরু হতেই ১০টি নৌকা একসঙ্গে নদীর বুক চিরে ছুটতে শুরু করে। একই রঙের পোশাক পরা মাঝিমাল্লারা সর্দারের নির্দেশনায় সমন্বিতভাবে বৈঠা চালিয়ে এগিয়ে যান।
বৈঠার প্রতিটি আঘাতে নদীর পানি ছিটকে ওঠে। নৌকাগুলোর গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে দর্শকদের করতালি ও উচ্ছ্বাস। ‘হেইও’ ধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে তিতাসের দুই তীর।
দুপুর ২টায় প্রতিযোগিতার উদ্বোধন করেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল।
ঐতিহ্য ধরে রাখার প্রত্যয়
নৌকা বাইচ শুধু একটি প্রতিযোগিতা নয়—তিতাসপাড়ের মানুষের কাছে এটি আবেগ, ঐতিহ্য ও শেকড়ের সঙ্গে সম্পর্কের প্রতীক। নদী ও নৌকার সঙ্গে এ অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা এবং সংস্কৃতির সম্পর্ক দীর্ঘদিনের।
জেলা প্রশাসক মো. আবুসাঈদ বলেন, “নৌকা বাইচ বাংলার ঐতিহ্যের অংশ। হাওর অধ্যুষিত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষের জীবনের সঙ্গে নৌকার সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে প্রতিবছর এ আয়োজন অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।”
দর্শকদের উচ্ছ্বাস
দীর্ঘ বিরতির পর নৌকা বাইচ দেখতে পেরে উচ্ছ্বসিত দর্শকরাও। দর্শক সোহেল ও শামীম আহমেদ বলেন, “ছোটবেলায় এমন আয়োজন দেখেছি। অনেক দিন পর আবার তিতাসে নৌকা বাইচ দেখতে পেরে খুব ভালো লাগছে। এই আয়োজন নিয়মিত হওয়া উচিত।”
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল বলেন, “ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ঘিরে বিভিন্ন সময় নানা মন্তব্য করা হয়। কিন্তু আজকের এই আয়োজন প্রমাণ করে, এখানকার মানুষ নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে এখনও হৃদয়ে ধারণ করে রেখেছেন।”
শাপলা বয়েজ ক্লাব চ্যাম্পিয়ন
প্রতিযোগিতার শেষ মুহূর্ত ছিল সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ। নদীর বুক চিরে দুরন্ত গতিতে এগিয়ে যায় প্রতিযোগী নৌকাগুলো। দুই তীরে থাকা দর্শকদের চিৎকার, করতালি আর উৎসাহে তৈরি হয় টানটান উত্তেজনা।
শেষ পর্যন্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার ক্ষমতাপুরের শাপলা বয়েজ ক্লাব প্রথম স্থান অর্জন করে। দ্বিতীয় হয় মজলিশপুরের জয়নাল আবেদিন ও জিল্লুর রহমানের দল। আর তৃতীয় স্থান অর্জন করে নবীনগর উপজেলার ফইল দল।
প্রতিযোগিতা শেষে বিজয়ীদের হাতে ট্রফি ও মোট সাড়ে চার লাখ টাকার পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।
শুধু প্রতিযোগিতা নয়, ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণ
নৌকা বাইচ শেষ হলেও তিতাসের দুই পাড়ে দীর্ঘ সময় ছিল উৎসবের আমেজ। সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে নদী যখন ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসে, তখনও মানুষের মুখে মুখে ফিরছিল বৈঠার সেই ছন্দ।
তিন বছর পর নৌকা বাইচের আয়োজন যেন নতুন করে মনে করিয়ে দিল—তিতাস শুধু একটি নদীর নাম নয়। এই নদীর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষের ইতিহাস, সংস্কৃতি, আবেগ ও শেকড়ের গল্প। আর বৈঠার প্রতিটি ছন্দে সেই ঐতিহ্যই যেন আবার প্রাণ ফিরে পেল।
