নাসিরনগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলা সদরের কলেজ মোড় থেকে পূর্বভাগ ইউনিয়নের ভুবন গ্রাম পর্যন্ত ৯ কিলোমিটার সড়কের নির্মাণকাজ তিন বছরেও শেষ হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে অসম্পূর্ণ অবস্থায় পড়ে থাকায় বৃষ্টি হলেই সড়কজুড়ে কাদা ও খানাখন্দের সৃষ্টি হচ্ছে। এতে নাসিরনগর সদরসহ চারটি ইউনিয়নের প্রায় ৮০ হাজার মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।
সম্প্রতি সড়কটির বেহাল দশা নিয়ে স্থানীয় এক বাসিন্দার মাইকিংয়ের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। গত ৯ আগস্ট সৈয়দ মৌলুদ নামে ওই ব্যক্তি মাইকিং করে দ্রুত সড়ক সংস্কারের দাবি জানান এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য এম এ হান্নানের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। মাইকিংয়ে তিনি বিশেষ করে গোকর্ণ ইউনিয়নের মানুষের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরেন।
১৮ কোটি টাকার প্রকল্প, কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৫ সালে
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, নাসিরনগর উপজেলা সদর থেকে হবিগঞ্জের মাধবপুর পর্যন্ত সড়কটির মোট দৈর্ঘ্য ১৮ দশমিক ১ কিলোমিটার। এর মধ্যে নাসিরনগর সদর থেকে পূর্বভাগ ইউনিয়নের ভুবন গ্রাম পর্যন্ত ৯ কিলোমিটার সড়ক সংস্কারের জন্য ২০২৩ সালের ২২ নভেম্বর কার্যাদেশ দেওয়া হয়।
১৮ কোটি টাকা চুক্তিমূল্যের এ কাজ পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স হাসান এন্টারপ্রাইজ। কার্যাদেশ অনুযায়ী সড়কটির প্রস্থ ২৪ ফুট হওয়ার কথা। এর মধ্যে ১৮ ফুট পাকা এবং ছয় ফুট মাটির অংশ রাখার কথা রয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী ২০২৫ সালের ২৮ মার্চের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় ২০২৬ সালের ৪ মে পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়। বর্ধিত সময়েও কাজ শেষ হয়নি। এখন তৃতীয় দফায় ২০২৭ সালের ৪ মে পর্যন্ত সময় বাড়ানোর আবেদন করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
কোথাও কার্পেটিং, কোথাও কাদা-খানাখন্দ
সরেজমিনে দেখা গেছে, নাসিরনগর কলেজ মোড় থেকে ফুলপুর পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার সড়কে কার্পেটিং করা হয়েছে। ফুলপুর সেতু থেকে নুরপুর সড়ক বাজারের আগ পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার অংশে ম্যাকাডাম করা হয়েছে। নুরপুর সড়ক বাজারের প্রায় ২০০ মিটার অংশে ঢালাইয়ের কাজও হয়েছে।
নুরপুর থেকে চৈয়ারকুড়ি বাজার পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার অংশে ম্যাকাডাম করা হলেও সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে সেখানে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য খানাখন্দ ও কাদা। অন্যদিকে চৈয়ারকুড়ি বাজার থেকে ভুবন গ্রামের দিকে প্রায় ছয় কিলোমিটার সড়কের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। সড়কের বিভিন্ন স্থানে ভাঙাচোরা ও বড় বড় খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে।
জেঠাগ্রামের বাসিন্দা মিজান মিয়া বলেন, ‘সড়কের অবস্থা খুব খারাপ। আমরা কষ্টে আছি।’
৬৫ শতাংশ কাজ শেষ, বিল নিয়েছেন ৯ কোটি ১৮ লাখ টাকা
এলজিইডি নাসিরনগর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৮ কোটি টাকা চুক্তিমূল্যের এ প্রকল্পে এখন পর্যন্ত ঠিকাদার ৯ কোটি ১৮ লাখ টাকা বিল নিয়েছেন। প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি প্রায় ৬৫ শতাংশ।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী খায়রুল হাসান বলেন, বর্ষা মৌসুমের কারণে জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর—এই তিন মাস সড়কে কার্পেটিংয়ের কাজ বন্ধ থাকে। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে পুরোদমে কাজ শুরু করার কথা জানান তিনি।
কাজ শেষ হতে দেরির কারণ হিসেবে বন বিভাগের গাছ কাটতে সময় লাগার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর দাবি, গাছ কাটতে বিলম্ব হওয়ায় সড়কের কাজ বুঝে পেতেও দেরি হয়েছে।
ঠিকাদারের গাফিলতিকে দায়ী করছে এলজিইডি
তবে সড়কের বর্তমান বেহাল অবস্থার জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতিকে দায়ী করেছেন এলজিইডির নাসিরনগর উপজেলা প্রকৌশলী আবদুল মমিন।
তিনি বলেন, ঠিকাদার আবারও কাজের মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করেছেন। এবার দ্রুত কাজ শেষ হবে বলে আশা করছেন তাঁরা।
চার ইউনিয়নের মানুষের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ সড়ক
নাসিরনগর সদর, গোকর্ণ, পূর্বভাগ ও হরিপুর ইউনিয়নের বাসিন্দাদের পাশাপাশি হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার মানুষও এ সড়কটি নিয়মিত ব্যবহার করেন। ফলে দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণকাজ অসম্পূর্ণ থাকায় প্রতিদিনই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে কয়েকটি ইউনিয়নের হাজারো মানুষকে।
স্থানীয়দের দাবি, বর্ষা ও কাদার দুর্ভোগ থেকে মানুষকে মুক্তি দিতে দ্রুত সড়কটির নির্মাণকাজ শেষ করতে হবে। পাশাপাশি কাজের মান নিশ্চিত করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
