২৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরে যানজট এখন নিত্যদিনের দুর্ভোগে পরিণত হয়েছে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়গুলোতে দীর্ঘ যানজটে আটকে থাকতে হচ্ছে সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ীদের। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সড়কে আটকে থেকে নষ্ট হচ্ছে কর্মঘণ্টা, বাড়ছে ভোগান্তি।
শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে প্রতিদিন যানজটের সৃষ্টি হলেও দীর্ঘদিনেও এর স্থায়ী সমাধান হয়নি। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ছেন স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকেরা। যানজটের কারণে নির্ধারিত সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে ব্যাহত হচ্ছে কর্মজীবী মানুষের দৈনন্দিন কার্যক্রম।
‘সারাদিনের আয়ের বড় অংশ জ্যামেই পুড়ছে’
শহরের ভাদুঘর এলাকার বাসিন্দা ও অটোরিকশাচালক মো. ইমরান মিয়া বলেন, “সারাদিন গাড়ি চালিয়ে যা আয় হয়, তার বড় একটা অংশ জ্যামেই পুড়ছে। এতে আর্থিকভাবে আমাদের অনেক ক্ষতি হচ্ছে।”
তিনি জানান, প্রতিদিন সকাল ১০টার পর থেকেই ফকিরাপুল, বিরাসার রোড, পৈরতলা কালীবাড়ির মোড়, পাইকপাড়া, মধ্যপাড়া বাসস্ট্যান্ড থেকে মঠের গোড়া পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় যানজট তীব্র আকার ধারণ করে। দীর্ঘ সময় ধরে চলে এই অচলাবস্থা।
ব্যবসা-বাণিজ্যেও পড়ছে প্রভাব
তীব্র যানজটের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে শহরের ব্যবসা-বাণিজ্যেও। মৌলভীপাড়ার ব্যবসায়ী আরিফ ইফতেখার শাকিল বলেন, “অনিবন্ধিত অটোরিকশার উপদ্রব ও তীব্র যানজটের কারণে সময়মতো ডেলিভারি দিতে পারছি না। দোকানেও মালপত্র সঠিক সময়ে পৌঁছাচ্ছে না। এতে আমাদের প্রচুর আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে।”
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, যানজটের কারণে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় সময়ের পাশাপাশি বাড়ছে পরিবহন ব্যয়।
জরুরি রোগী নিয়েও শঙ্কা
যানজটের প্রভাব পড়ছে স্বাস্থ্যসেবাতেও। জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে আসা জরুরি ও সংকটাপন্ন রোগীদের অনেক সময় শহরের প্রবেশপথে দীর্ঘ যানজটে আটকে থাকতে হচ্ছে।
মুমূর্ষু রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সও যানজটে আটকে পড়ায় সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। এতে জরুরি রোগীদের জীবন নিয়ে তৈরি হচ্ছে শঙ্কা।
জনবল সংকটে ট্রাফিক বিভাগ
শহরের যানজট নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক বিভাগের জনবল সংকটের কথা জানিয়েছেন ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (টিআই) সোহরাব।
তিনি বলেন, দিন দিন মানুষের পাশাপাশি যানবাহনের সংখ্যাও বাড়ছে। কিন্তু সেই অনুপাতে ট্রাফিক বিভাগের জনবল বাড়েনি। ফলে সীমিত জনবল দিয়ে শহরের যানজট নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
টিআই সোহরাব জানান, যানজট নিয়ন্ত্রণ ও নাগরিকদের স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত করতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ট্রাফিক বিভাগে ১২ জন সার্জেন্ট, ১২ জন টিএসআই, ৩২ জন এটিএসআই এবং ৬০ জন কনস্টেবল প্রয়োজন।
যানজটপ্রবণ ১১ পয়েন্ট
ট্রাফিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, শহরে নিয়মিত যানজট সৃষ্টি হয় এমন ১১টি পয়েন্ট চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হলো—কাউতলী রোড, কালীবাড়ি মোড়, সিমরাইলকান্দি ব্রিজ, পৈরতলা, বিরাসা, ঘাটোরা, মেড্ডা সেকশন, কুমারশীল মোড়, ল্যাবএইড হাসপাতালের মোড়, কোর্ট রোড ও ফকিরাপুল।
এর মধ্যে ফকিরাপুল এলাকায় যানজটের তীব্রতা তুলনামূলক বেশি।
টিআই সোহরাব জানান, সাধারণত সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর ১টা এবং বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত শহরের বিভিন্ন সড়কে যানজট তীব্র আকার ধারণ করে।
প্রয়োজনের তুলনায় কম জনবল
বর্তমানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ট্রাফিক বিভাগে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৫ জন সার্জেন্ট, ৫ জন টিএসআই, ১১ জন এটিএসআই এবং ২৮ জন কনস্টেবল। এর মধ্যে কেউ কেউ নিয়মিত ছুটিতেও থাকেন।
শহরের ১১টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে দুই শিফটে দায়িত্ব পালনের জন্য এ জনবল পর্যাপ্ত নয় বলে জানান টিআই সোহরাব।
তিনি বলেন, কোনো পয়েন্টে সার্জেন্ট দায়িত্ব পালন করলে একই র্যাংকের কারণে সেখানে টিএসআই রাখা হয় না। ফলে সীমিত জনবল দিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট সামাল দিতে হচ্ছে।
শহরে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত অটোরিকশার সঠিক সংখ্যার তথ্যও ট্রাফিক বিভাগের কাছে নেই বলে জানান তিনি।
নিবন্ধিত ৪ হাজার, অনিবন্ধিত ৬ হাজারের বেশি
ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, শহরে নিবন্ধিত অটোরিকশার সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার। এর বাইরে অনিবন্ধিত অটোরিকশার সংখ্যা ৬ হাজারের বেশি।
পৌরসভার উপসচিব শরিফুল ইসলাম বলেন, বড় মার্কেট ও শপিং মলের সামনে অবৈধ পার্কিং যানজটের অন্যতম কারণ। বিষয়টি জেলা প্রশাসক ও আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় অবহিত করা হয়েছে। এ বিষয়ে শিগগিরই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
পার্কিং সংকটও বড় কারণ
ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, শহরের বড় শপিং মল ও মার্কেটগুলোতে পর্যাপ্ত নিজস্ব পার্কিং ব্যবস্থা না থাকাও যানজটের অন্যতম কারণ।
ফলে সড়কের পাশে ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে গাড়ি পার্কিং করায় সড়কের কার্যকর প্রশস্ততা কমে যাচ্ছে। এতে যানবাহনের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয়ে তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট।
স্থায়ী সমাধানের দাবি
শহরের বাসিন্দাদের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে যানজটের এই সমস্যা থাকলেও স্থায়ী সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। সময়ের সঙ্গে শহরের জনসংখ্যা ও যানবাহনের সংখ্যা বাড়লেও সেই তুলনায় সড়ক ব্যবস্থাপনা ও ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় সক্ষমতা বাড়েনি।
নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, যানজট নিরসনে বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। অনিবন্ধিত যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, ট্রাফিক বিভাগের জনবল বৃদ্ধি, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়ে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং বড় মার্কেটগুলোতে বাধ্যতামূলক পার্কিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে জনসংখ্যা ও যানবাহনের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের যানজট পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
