মোহাম্মদ অলিউল্লাহ খান
বিশেষ প্রতিনিধি ও পরিবেশকর্মী
তারিখ: ৩ আগস্ট ২০২৬ / ১৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বুক চিরে বয়ে চলা তিতাস নদী আজ এক গভীর Existential Crisis বা অস্তিত্ব সংকটে ধুঁকে ধুঁকে মরছে। এককালের প্রমত্তা ও প্রাণবন্ত এই নদীটি আজ প্রতিদিনের নির্মম অবহেলা আর নির্বিচারে ফেলা প্লাস্টিক বর্জ্যের কারণে মৃত্যুর মুখে পতিত হয়েছে।
জেলা সদরের মেড্ডা কালভৈরব মন্দিরের পাশে তিতাস নদীর তীর আজ খোলা ডাস্টবিনে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন সেখানে শত শত টন প্লাস্টিক বর্জ্য, পলিথিন ব্যাগ এবং অপচনশীল প্লাস্টিক সামগ্রীর বিশাল Dump বা স্তূপ করে রাখা হচ্ছে। বাতাস ও বৃষ্টির টানে এসব বর্জ্য সরাসরি গড়িয়ে পড়ছে নদীর স্বচ্ছ জলে। পলিথিন আর প্লাস্টিকের এই অন্তহীন আগ্রাসনে নদীর স্বাভাবিক Flow বা স্রোত এবং গতিপ্রকৃতি আজ সম্পূর্ণ থমকে গেছে।
যুক্তরাজ্যের কিংস কলেজ লন্ডনের পরিবেশ বিজ্ঞানী ড. স্টেফানি রাইট তাঁর ২০১৩ সালের গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, নদীতে ও জলাশয়ে জমা হওয়া প্লাস্টিক ও Microplastics কণা জলজ প্রাণীর দেহে প্রবেশ করে তাদের Digestive System বা পরিপাকতন্ত্র বন্ধ করে দেয় এবং প্রজনন চক্র মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। এছাড়া প্লাস্টিক কখনোই পুরোপুরি পচে পানিতে মেশে না; সূর্যালোক ও ঘর্ষণের মাধ্যমে এগুলো ভেঙে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়।
এই বিষাক্ত কণাগুলো জলজ প্রাণীর মাধ্যমে Food Chain বা খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করে এবং মানবদেহে ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগের সৃষ্টি করে।
প্লাস্টিকের স্তূপ নদীর তলদেশে পলিথিনের আস্তরণ তৈরি করায় জলজ উদ্ভিদের পুষ্টি গ্রহণ ও গ্যাস বিনিময়ের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়, যার ফলে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যায় এবং পুরো Aquatic Ecosystem বা জলীয় বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হয়।
একদিকে নদী ও খাল দখলের মহোৎসব, অন্যদিকে তীরের এই বেপরোয়া প্লাস্টিক দূষণ—দুইয়ের যাঁতাকলে পড়ে তিতাস নদীর প্রাণবায়ু আজ নিঃশেষ হওয়ার পথে। স্থানীয় প্রভাবশালী মহল ও জনসচেতনতার প্রভাব নদীর এই করুণ পরিণতির জন্য সরাসরি দায়ী।
নদীর তীর দখল করে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা এবং ময়লার স্তূপ অপসারণে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের ভূমিকা আজ চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।
মেড্ডা কালভৈরবসহ তিতাস নদীর তীরবর্তী সকল পয়েন্টে প্লাস্টিক ও পলিথিন ফেলা অবিলম্বে নিষিদ্ধ করতে হবে।
নদীকে বাঁচাতে অবিলম্বে তীরের সমস্ত প্লাস্টিক বর্জ্য ও পলিথিনের স্তূপ দ্রুত অপসারণ করতে হবে এবং নদী দখল ও দূষণের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
প্রকৃতির রক্তিম চোখ রাঙানি এবং পরিবেশ ধ্বংসের এই তাণ্ডব দেখতে দেখতে যদি আজ আমরা সোচ্চার না হই, তবে অচিরেই তিতাস নদী মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে। একটি নদী মরে যাওয়া মানে একটি সভ্যতার অংশ শেষ হয়ে যাওয়া। সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস নদী রক্ষায় জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরকে জরুরি ভিত্তিতে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
