মোছাব্বির হাসান সজীব, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা ও আখাউড়া দুই সীমান্তঘেঁষা উপজেলা, দীর্ঘদিন ধরেই অবহেলা, বেকারত্ব ও সীমিত শিল্পায়নের বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে আসছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই অঞ্চলকে ঘিরে যে বড় পরিকল্পনার কথা সামনে এসেছে, তা নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে স্থানীয় জনগণের মধ্যে।
প্রস্তাবিত আধুনিক ইপিজেড (এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন) বাস্তবায়িত হলে এই অঞ্চলই হতে পারে দেশের অন্যতম শিল্প ও কর্মসংস্থানের কেন্দ্রবিন্দু। স্থানীয়ভাবে আলোচিত এই প্রকল্পের অন্যতম উদ্যোক্তা আলহাজ্ব কবির আহমেদ ভূঁইয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কের পাশে প্রায় তিন লাখ পির বিস্তীর্ণ এলাকায় গড়ে তোলা হতে পারে এই ইপিজেড।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, এখানে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য আধুনিক শিল্প সুবিধা নিশ্চিত করা হবে, যা আন্তর্জাতিক মানের শিল্পাঞ্চল হিসেবে গড়ে উঠবে।কর্মসংস্থানের নতুন দুয়ার, এই ইপিজেডের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা দেখা হচ্ছে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সরাসরি ও পরোক্ষভাবে লাখো যুবকের কাজের সুযোগ সৃষ্টি হবে। বিশেষ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কসবা, আখাউড়া এবং পার্শ্ববর্তী কুমিল্লা জেলার তরুণদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হলে স্থানীয় বেকারত্বের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। শুধু চাকরি নয়, প্রায় ৫ লাখ পরিবারের আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ছোট ব্যবসা, পরিবহন, সরবরাহ ব্যবস্থা, খাদ্যসেবা, আবাসনসহ নানা খাতে গড়ে উঠবে নতুন উদ্যোক্তা শ্রেণি।
ফলে একটি শিল্পাঞ্চলকে ঘিরে তৈরি হবে একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেম। শিল্পায়ন ও অর্থনীতির গতিপথ বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি ইপিজেড শুধু কারখানার সমষ্টি নয় এটি একটি অঞ্চলের অর্থনৈতিক গতিপথ বদলে দেওয়ার শক্তিশালী মাধ্যম।
এখানে গার্মেন্টস, ইলেকট্রনিক্স, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, প্লাস্টিক, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণসহ বহুমুখী শিল্প স্থাপনের সুযোগ রয়েছে। এসব শিল্পের উৎপাদিত পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি হলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে।এছাড়া স্থানীয়ভাবে কাঁচামাল সরবরাহ, পরিবহন ও সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটবে। এতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন বাজার তৈরি হবে, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করে তুলবে। কসবা-আখাউড়া সীমান্তবর্তী অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে মাদক ও চোরাচালানের ঝুঁকিতে রয়েছে।
কর্মসংস্থানের অভাবকে অনেক সময় এই সমস্যার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হয়। ইপিজেড বাস্তবায়িত হলে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে, ফলে যুবসমাজ বিকল্প জীবিকার পথ খুঁজে পাবে। উৎপাদনমুখী কাজে সম্পৃক্ততা বাড়লে মাদকাসক্তি ও অপরাধ প্রবণতা কমে আসবে। একই সঙ্গে নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পেলে পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামোতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
অবকাঠামোগত উন্নয়নের গতি একটি ইপিজেড স্থাপনের সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এলাকায় ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটে থাকে। নতুন সড়ক, বিদ্যুৎ সংযোগ, পানি সরবরাহ, যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যসেবার বিস্তার ঘটে। ফলে একটি শিল্পাঞ্চলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে একটি আধুনিক জনপদ কসবা-আখাউড়া অঞ্চলেও এমন উন্নয়নের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কের পাশে অবস্থান হওয়ায় এই ইপিজেডটি যোগাযোগের দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে এই বৃহৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণ, পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা, পর্যাপ্ত অবকাঠামো নিশ্চিতকরণ এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালা প্রণয়ন এসব বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।এছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, সুশাসন ও স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই ইপিজেডকে একটি টেকসই উন্নয়ন মডেল হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।
সবকিছু ঠিকঠাকভাবে বাস্তবায়িত হলে কসবা-আখাউড়া অঞ্চলের এই ইপিজেড শুধু ব্রাহ্মণবাড়িয়া বা কুমিল্লা জেলার জন্যই নয়, বরং পুরো দেশের জন্য একটি মডেল হয়ে উঠতে পারে। এটি হতে পারে কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন ও সামাজিক উন্নয়নের এক অনন্য উদাহরণ।লাখো মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার সম্ভাবনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে এই পরিকল্পনা। এখন প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ, সুদূরপ্রসারী দৃষ্টি এবং সমন্বিত প্রয়াস যার মাধ্যমে একটি স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে পারে।
লেখক :-
কবীর আহমেদ ভূঁঞা
আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক ও উন্নয়ন কৌশলবিদ, প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, ভূঁইয়া গ্লোবাল ফাউন্ডেশন।
